মিরপুরে ৭ বছরের শিশু লামিসার নির্মম হত্যা: বিবেকহীন এই পৈশাচিকতার নেপথ্যে কি মাদকের ভয়াল থাবা?

আব্দুল্লাহ আল মামুন: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। মাত্র সাত বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশু কন্যা লামিসাকে ধর্ষণের পর গলাকেটে বা শিরশ্ছেদ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পল্লবী থানার ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি বাসায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

পেশায় রিকশার মিস্ত্রি বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং গৃহিণী মা পারভিনের আদরের সন্তান ছিল লামিসা। তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার শিয়ালদীতে। অভাবের সংসারে বাবা-মা যখন কাজের সন্ধানে বা জীবনসংগ্রামে ব্যস্ত, তখন তাদের পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩২) নামের এক পাষণ্ড এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটায়। পুলিশ ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং মূল আসামিকে গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে— একজন মানুষ কীভাবে ৭ বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর এমন পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে গলাকেটে হত্যা করতে পারে? সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষের পক্ষে কি এমন কাজ করা সম্ভব?

সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন লোমহর্ষক এবং বিবেকহীন অপরাধের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সমাজে মরণনেশা ‘ইয়াবা’ সহ অন্যান্য ভয়ংকর মাদকের বিস্তার। মাদকাসক্তি যুবসমাজের মস্তিষ্ককে বিকৃত করে তাদের ‘সাইকো’ বা মানসিক বিকারগ্রস্ত করে তুলছে, যার চরম পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে লামিসার মতো নিরীহ শিশুদের।


ইয়াবা মূলত মেথামফেটামিন (Methamphetamine) এবং উচ্চমাত্রার ক্যাফেইনের (Caffeine) মিশ্রণে তৈরি একটি সিন্থেটিক মাদক। এর সাথে কৃত্রিম রঙ ও ফ্লেভার মিশিয়ে একে আকর্ষণীয় করা হয়। এই মাদক মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে সরাসরি আঘাত হানে।

দীর্ঘদিন বা নিয়মিত ইয়াবা সেবনের ফলে মানুষের মধ্যে হ্যালুসিনেশন ও প্যারানয়া (অবাস্তব কিছু দেখা বা শোনা এবং অহেতুক সন্দেহবাতিকতা) তৈরি হয়। এর প্রভাবে আসক্ত ব্যক্তির মেজাজ চরম খিটখিটে ও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। তাদের হিতাহিত জ্ঞান, নৈতিকতা ও বিবেক পুরোপুরি লোপ পায়। মাদকের নেশায় বুঁদ থাকা অবস্থায় একজন ব্যক্তি পশুর চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যার ফলে অবলীলায় সে শিশু ধর্ষণ বা গলাকেটে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটাতে পারে।


মাদক বা ইয়াবা শুধু একজন ব্যক্তির শরীর ধ্বংস করে না, এটি পুরো সমাজকে ক্যান্সারের মতো কুরে কুরে খায়। মাদকের কারণে আজ সমাজে পারিবারিক ভাঙন, চরম অশান্তি, চুরি-ছিনতাই এবং অপরাধ প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি।

মাদকাসক্ত অবস্থায় মানুষের স্বাভাবিক বিচার-বিবেচনা কাজ করে না। বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান বা শিশুদের প্রতি মায়া— কিছুই তাদের মস্তিষ্কে সাড়া দেয় না। একটি দেশের চালিকাশক্তি যুবসমাজ যখন এই মাদকের ছোবলে তাদের মেধা ও সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজ ও রাষ্ট্র এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। লামিসার এই হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সমাজ আজ কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।


বাংলাদেশে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির (সবচেয়ে ভয়ংকর) মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ২০০ গ্রামের বেশি ইয়াবা বহন বা বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এমনকি সেবনকারীদের জন্যও ৬ মাস থেকে ৫ বছর পর্যন্ত জেলের বিধান রয়েছে।

কিন্তু শুধু আইন থাকলেই হবে না, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু লামিসার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত পাষণ্ড সোহেল রানাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, এই ধরনের অপরাধের মূল কারণ যে মাদক, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।


সমাজে ইয়াবার মতো মাদকের বিস্তার যুবসমাজকে সাইকোপ্যাথ বা বিকারগ্রস্ত বানিয়ে ফেলছে, আর তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে নিরীহ শিশুরা। তাই দেশ থেকে মাদককে চিরতরে নির্মূল করতে হবে। কীভাবে দেশে মাদক ঢুকছে, কারা এর পেছনের গডফাদার— তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

একটি শিশুও যেন আর লামিসার মতো এমন পৈশাচিকতার শিকার না হয়, তার জন্য প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির পাশাপাশি আমাদের সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যুবসমাজকে এই মরণনেশার হাত থেকে রক্ষা করতে না পারলে, ভবিষ্যতে আমাদের আরও অনেক লামিসাকে হারাতে হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সম্পৃক্ত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button