
নিজস্ব প্রতিবেদক, মাদারীপুর: মাদারীপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ১৬ বছর বয়সী এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ফিল্মি স্টাইলে অপহরণের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এবং আসামির বাবার সরাসরি হুমকির পর পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভিকটিমকে ধর্ষণ, জোরপূর্বক বিয়ে বা পাচারের আশঙ্কা করছেন অসহায় পরিবার। এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে অপহৃত ছাত্রীকে উদ্ধারের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর সদর থানাধীন কোলচরী নিজগ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়ার মেয়ে মোসাঃ লামিয়া (১৬) স্থানীয় বিদ্যাবাগিস মহিলা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। মাদ্রাসায় যাওয়া-আসার পথে লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকার স্বপন মাদবরের বখাটে ছেলে মুহিম (২০) প্রায়ই তাকে উত্ত্যক্ত করত এবং কুপ্রস্তাব দিত।
বখাটে ছেলের এই আচরণের প্রতিকার চেয়ে লামিয়ার বাবা লাল মিয়া আসামি মুহিমের বাবা স্বপন মাদবরের (৪৫) কাছে বিচার দেন। কিন্তু বিচার তো দূরের কথা, উল্টো স্বপন মাদবর চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন, “আমার ছেলে মুহিমের সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। নইলে তোমার বাড়ি থেকে তোমার মেয়েকে তুলে এনে আমার ছেলের সাথে বিয়ে দিব।” মেয়ে নাবালিকা হওয়ায় লাল মিয়া এই অন্যায্য প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানান।
আসামি বাবার এই হুমকির পর থেকেই আসামিরা সুযোগ খুঁজতে থাকে। গত ১৭ মে, ২০২৬ রোজ রবিবার সকাল অনুমান ৮ ঘটিকার দিকে লামিয়া প্রতিদিনের মতো মাদ্রাসায় যাওয়ার জন্য একটি ভ্যান গাড়িতে ওঠে। পথিমধ্যে রাজারচর চৌকিদার বাড়ির সামনের পাকা রাস্তায় পৌঁছালে আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা মুহিম, তার বাবা স্বপন মাদবরসহ অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জন সন্ত্রাসী একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস দিয়ে ভ্যানটির গতিরোধ করে।
এ সময় তারা জোরপূর্বক নাবালিকা লামিয়াকে ভ্যান থেকে টেনেহিঁচড়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। লামিয়ার ডাক-চিৎকারে আশপাশের সাক্ষী ও সাধারণ মানুষ দৌড়ে এলেও আসামিরা দ্রুত গাড়ি হাঁকিয়ে মাদারীপুর শহরের দিকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে মেয়ের সন্ধান না পেয়ে এবং থানা পুলিশের তরফ থেকে তাৎক্ষণিক মামলা গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায়, অসহায় বাবা লাল মিয়া সরাসরি মাদারীপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে (পিটিশন মামলা নং- ৯৭/২০২৬) মামলা দায়ের করেন।
মামলার ভয়াবহতা, আসামিদের পূর্বপরিকল্পিত হুমকি এবং ভিকটিমের জীবনের ঝুঁকির বিষয়টি আমলে নিয়ে আদালতের বিজ্ঞ বিচারক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) জনাব মোঃ শরীফ হোসেন হায়দার একটি কঠোর আদেশ প্রদান করেন।
আদেশে মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নালিশী দরখাস্তটি সরাসরি ‘এজাহার’ (FIR) হিসেবে গণ্য করে নিয়মিত মামলা রুজু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসাথে আগামী ২৮ মে, ২০২৬ তারিখের মধ্যে অপহৃত ভিকটিমকে উদ্ধার করে ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করার জন্য ওসিকে কড়া নির্দেশ দিলে সঠিক সমেয় আসামীকে গ্রেফতার আদালতে প্রেরন করেন।
অপহৃত লামিয়ার বাবা লাল মিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার মেয়ে এখনো নাবালিকা। আসামিরা প্রভাবশালী ও বেপরোয়া। তারা আমার মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বিয়ে, ধর্ষণ বা বিদেশে পাচার করে দিতে পারে। আমি অবিলম্বে আমার মেয়ের উদ্ধার এবং আসামিদের ফাঁসির মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যাতে তারা কোনোভাবেই জামিন পেয়ে পার পেয়ে না যায়।
প্রকাশ্য দিবালোকে একজন মাদ্রাসা ছাত্রীকে এভাবে তুলে নেওয়ার ঘটনায় মাদারীপুর জেলাজুড়ে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হবে।




