৩০ বছরের দীর্ঘ নিঃশ্বাস: অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে আলোয় ফেরা এক মায়ের অশ্রুসিক্ত গল্প

নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি: কারাগারের লোহার ফটকটি যখন ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল, তখন বাইরের উজ্জ্বল সূর্যের আলোয় চোখ দুটি মেলতে পারছিলেন না ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা রাহেলা বেগম। দীর্ঘ ৩০টি বছর! এই ৩০ বছরে বাইরের পৃথিবীটা কতটা বদলে গেছে, তা তাঁর জানা নেই। জীবনের সোনালী সময়গুলো যেখানে মাটির দেয়াল আর লোহার শিকের আড়ালে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়েছে, সেখানে আজ মুক্তির স্বাদ যেন তাঁর কাছে এক অদ্ভুত ঘোর।
গত রবিবার ১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ইং নওগাঁ জেলা কারাগারের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে রাহেলা বেগমের দুই চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি অশ্রুবিন্দু যেন ৩০ বছরের এক একটি না বলা যন্ত্রণার মহাকাব্য।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দীঘা গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বেগম। এক হত্যা মামলায় যখন তিনি কারাগারে নীত হয়েছিলেন, তখন তিনি ছিলেন ভরা যৌবনের এক নারী। আজ যখন ফিরছেন, তখন তাঁর শরীরে বার্ধক্যের ছাপ, চামড়া কুঁচকে গেছে, লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে হয়। দীর্ঘ ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড শেষে তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৫ হাজার ৫০০ টাকা। আদালতের দেওয়া সেই জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আরও এক বছর এক মাস অতিরিক্ত জেল খাটার প্রহর গুনছিলেন এই অসহায় বৃদ্ধা।
কিন্তু মানুষের মাঝেও তো অমানুষের ভিড়ে দেবতা থাকে। রাহেলা বেগমের এই করুন দশা দেখে এগিয়ে এলেন নওগাঁ জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ। মানবিকতার অনন্য নজির গড়ে তাঁরা নিজেরাই এই বৃদ্ধার জরিমানার টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। আর সেই মহানুভবতায় আজ জীবনের শেষ বেলায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলেন রাহেলা।
কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় রাহেলা বেগমের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসছিল। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, “বাপু, ভাবছিলাম জেলের ভিতরেই আমার মরণ হবে। পরিবারের মানুষগুলোর মুখ কি আর দেখতে পাব? এই দুনিয়াটা কেমন আছে তাও তো জানতাম না। আজ যারা আমাকে এই বয়সে মুক্তির সুযোগ করে দিলেন, আল্লাহ তাদের ভালো করুক। জীবনের শেষ কটা দিন অন্তত আপন মানুষের ছায়ায় মরতে পারব।”
মুক্তির পর তাঁর সেই কাঁপাকাঁপা হাতে যখন পরিবারের স্বজনদের ছুঁয়ে দেখছিলেন, তখন উপস্থিত অনেকের চোখেই জল নেমে আসে। যে মানুষটি দীর্ঘ তিন দশক ধরে পৃথিবীর আনন্দ-বেদনা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, তাঁর কাছে এই মুক্তি যেন এক পুনর্জন্ম।
নওগাঁ জেলা কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং একজন অসহায় ও বৃদ্ধ কয়েদির প্রতি মানবিক মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে বয়স্ক কয়েদিদের প্রতি এমন সহমর্মিতা সমাজে এক ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে।
রাহেলা বেগম বাড়ি ফিরছেন। হয়তো সেই চেনা ঘরটি আর নেই, নেই সেই চেনা মানুষগুলোও। তবুও ৩০ বছর পর এক জনম দুঃখী মায়ের এই ঘরে ফেরা নওগাঁবাসীর মনে এক গভীর আবেগের জন্ম দিয়েছে। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা এই পথচলা যেন সব হারানো মানুষের শেষ আশার আলো হয়ে জ্বলছে

সম্পৃক্ত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button