ইসির নিয়োগে লঙ্কাকাণ্ড: ১৮ হাজার পরীক্ষার্থীর অটোপাস ও ১৯ বছরের অভিজ্ঞদের ছাঁটাই আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আগামীকাল ১০ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য লিখিত পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে কর্মরত কর্মীরা। ‘অটোপাস’ কেলেঙ্কারি, প্রবেশপত্রে ছবি বিভ্রাট এবং অবৈধ কোচিং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এখন চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

তথ্য অনুযায়ী, প্রিলিমিনারি বা নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ১৮ হাজার ৮১৫ জন পরীক্ষার্থীর কাউকেই অকৃতকার্য করানো হয়নি। সবাইকে ‘অটোপাস’ দিয়ে লিখিত পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়োগ ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। অভিযোগ উঠেছে, আগারগাঁও কেন্দ্রিক একটি অসাধু ‘কোচিং ও মেস সিন্ডিকেট’ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই অটোপাস প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছে। সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

২০০৭ সাল থেকে যারা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশের ভোটার ডাটাবেজ ও এনআইডি (NID) তৈরির কাজ করে আসছেন, সেই অভিজ্ঞ কর্মীদের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকারে। আবেদনে তারা উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘ ১৯ বছর যাবৎ প্রতিদিন রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তারা রাষ্টীয় দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানের এই তড়িঘড়ি পরীক্ষা মূলত তাদের ছাঁটাই করার একটি অপকৌশল। ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও স্মার্ট কার্ড বিতরণের মতো সংবেদনশীল কাজের মাঝখানে তাদের প্রস্তুতির সময় না দিয়েই পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রবেশপত্রের ভুলভ্রান্তি দেখে। অনেক পরীক্ষার্থীর অভিযোগ, ডাউনলোড করা প্রবেশপত্রে একজনের ছবির সাথে অন্যজনের স্বাক্ষর এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রার্থীর তথ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। এই চরম কারিগরি অব্যবস্থাপনার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া হলে তা কতটা ন্যায়সংগত হবে, তা নিয়ে পিটিশনাররা সংশয় প্রকাশ করেছেন।

মহামান্য হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিট পিটিশন (নং-৭৪৬৩/২০২৩)-এর রায় অনুযায়ী নিয়োগ পাওয়ার অধিকার থাকার পরও, ইসি কর্তৃপক্ষ আইনি আদেশের তোয়াক্কা না করে পরীক্ষা নিতে চাচ্ছে। অভিজ্ঞ কর্মীদের দাবি, আদালতের নির্দেশনার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এবং তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এই ‘বিতর্কিত’ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে দেওয়া পত্রে কর্মীরা ৩টি প্রধান দাবি জানিয়েছেন ১. ১০ জুলাইয়ের বিতর্কিত লিখিত পরীক্ষা অবিলম্বে স্থগিত করা ২. নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হওয়া ‘অটোপাস’ ও কারিগরি বিভ্রাটের সুষ্ঠু তদন্ত করা ৩. দীর্ঘ ১৯ বছরের কাজের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করে তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ করা।

নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়ে এমন হযবরল পরিস্থিতি দেশের শিক্ষিত বেকার সমাজ এবং কর্মরত অভিজ্ঞ কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি করেছে। এখন সবার নজর কালকের পরীক্ষার দিকে—কমিশন কি স্বচ্ছতা বজায় রাখবে, নাকি বিতর্কের মুখেই পরীক্ষা সম্পন্ন করবে।

সম্পৃক্ত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button