
রায়হান মিয়া, সদরপুর (ফরিদপুর) : রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। কিন্তু ফরিদপুরের সদরপুরে সেই স্তম্ভের ওপর যখন পৈশাচিক হামলা হয় এবং খোদ থানার ভেতর পুলিশের সামনেই যখন সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসীরা তান্ডব চালায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—সদরপুরে কি তবে আইনি শাসনব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পড়েছে? নাকি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা জ্বালানি পাচারকারী মাফিয়াদের কাছে নিজেদের শিরদাঁড়া বন্ধক দিয়েছেন?
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং পরবর্তীতে থানা প্রশাসনের রহস্যজনক ও ন্যাক্কারজনক ভূমিকার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা জেলা। এর প্রতিবাদে উপজেলা প্রশাসন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানা পুলিশের যাবতীয় সংবাদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে উপজেলার ৬টি সাংবাদিক সংগঠন।
ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার। সদরপুর ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ‘তেল পাচার’ সিন্ডিকেটের ভিডিও ধারণ করতে যান ‘দৈনিক আমার সংবাদ’-এর তোফাজ্জেল হোসেন টিটু এবং ‘জাগরণী টিভি’র আলমগীর হোসেন। অপরাধীর চেহারা ক্যামেরাবন্দি হওয়ামাত্রই পাম্প মালিক মোহাম্মদ আলীর নির্দেশে তাঁর পোষা সন্ত্রাসীরা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে এই কলম সৈনিকদের ওপর। তাঁদের অপরাধ? তাঁরা সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার সাহস করেছিলেন।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, আহত সাংবাদিকরা যখন রক্তাক্ত অবস্থায় ন্যায়বিচারের আশায় থানায় আশ্রয় নেন, সেখানেও তাঁরা নিরাপদ ছিলেন না। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই থানার ভেতরে সাংবাদিক টিটু ও আলমগীরের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার শপথ নেওয়া পুলিশ সদস্যরা তখন কেবল দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন না, বরং তাঁদের নীরবতা সন্ত্রাসীদের আরও উৎসাহিত করেছে। পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে খোদ ওসির পক্ষ থেকে ‘আপস’-এর প্রস্তাব দেওয়া হয়। অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করে ভুক্তভোগীকে আপসের কথা বলা কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? এটি কি সরাসরি অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়ার নামান্তর নয়?
প্রশাসনের এই নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে সোমবার রাত ৮টায় সদরপুর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এক জরুরি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সদরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে ৬টি সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এই পঙ্গু প্রশাসনের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন।
সভায় ঢাকা ক্রাইম বিডির সম্পাদক ও প্রকাশক রাজীব হাসান, শিমুল তালুকদার, সাব্বির হাসান, সোবাহান সৈকত এবং দৈনিক ইনকিলাবের কবির হোসাইনসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “প্রশাসন আজ মাফিয়াদের পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে প্রশাসন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই প্রশাসনের কোনো সংবাদ পরিবেশন করে আমরা জনগণের বিভ্রান্তি বাড়াতে চাই না।”
সাংবাদিক নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হামলাকারী মোহাম্মদ আলী ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হবে, ততক্ষণ সদরপুর উপজেলা প্রশাসন ও থানা কর্তৃপক্ষের কোনো খবর দেশের কোনো গণমাধ্যমে স্থান পাবে না। এই বর্জন কর্মসূচি কেবল সংবাদ বর্জন নয়, বরং এটি দুর্নীতির সঙ্গে প্রশাসনের আঁতাতের বিরুদ্ধে একটি নীরব যুদ্ধ।
সদরপুরের আকাশ-বাতাস আজ এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। সাংবাদিকরা আজ একতাবদ্ধ। প্রশাসনের এই বিমাতাসুলভ আচরণ এবং সন্ত্রাসীদের প্রতি তাদের ‘মমতা’ জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কি তাঁর ‘ভুল’ শুধরে অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, নাকি মাফিয়াদের স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের সুনামকে বিসর্জন দিয়েই চলবে? সদরপুরবাসী আজ জবাব চায়।



