
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: একটি দীর্ঘ সংগ্রামের অবসান। এক বর্ণাঢ্য কিন্তু কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি। অশ্রুসিক্ত নয়নে ও লাখো মানুষের ভালোবাসায় বিদায় নিলেন বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি।
বিকেল সাড়ে ৪টার পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে দুপুর থেকেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবন এলাকা পরিণত হয়েছিল এক জনসমুদ্রে। প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন লাখ লাখ মানুষ। বিকেল তিনটায় অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সর্বস্তরের মানুষ। জানাজা শেষে যখন তাঁর মরদেহ বিশেষ বাহনে করে জিয়া উদ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন চারদিকের আকাশ-বাতাস কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে।
খালেদা জিয়ার এই বিদায় কেবল একজন রাজনীতিকের প্রস্থান নয়, বরং এক দীর্ঘ বঞ্চনা ও লড়াইয়ের ইতিহাসের সমাপ্তি। গত ১৬ বছরের শাসনামলে তাঁকে সইতে হয়েছে অবর্ণনীয় জুলুম ও নির্যাতন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে নির্জন কারাকক্ষে। উন্নত চিকিৎসার অধিকারটুকু থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল এই বর্ষীয়ান নেত্রীকে। লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, কিডনি ও হৃদরোগের মতো জটিল অসুখগুলো তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল ওই বন্দীকালেই। এমনকি বিদেশের হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি না পাওয়ায় গুলশানের ‘ফিরোজা’ বাসভবনই ছিল তাঁর জন্য এক প্রকার কারাগার।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর শেখ হাসিনার পতনের মাধ্যমে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ ১১৭ দিন পর গত মে মাসে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফিরলেও বয়সের ভার ও দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাঁকে জীর্ণ করে দিয়েছিল। গত ২৩ নভেম্বর আবারও অসুস্থ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। এক মাসেরও বেশি সময় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দেশের প্রথম এই নারী প্রধানমন্ত্রী।
দাফন শেষে কবরের পাশে যখন মোনাজাত করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের চোখের পানি থামানো যাচ্ছিল না। যে নেত্রী আজীবন গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন থেকেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেও মাথানত করেননি, তিনি আজ সব যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই এখন তাঁর শেষ ঠিকানা।
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা বন্দিত্ব, অসুস্থতা আর একাকীত্বের অবসান ঘটিয়ে বেগম জিয়া চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেলেন কোটি মানুষের ভালোবাসা আর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অমলিন অধ্যায়।




