দূষিত তিন নদী উদ্ধারে কাজ শুরু, বুড়িগঙ্গা নিয়ে চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা উপদেষ্টার

ফৌজিয়া আক্তার, ফরিদপুর: “নদী শুধু জলধারা নয়, নদী আমাদের জীবন, জীবিকা ও সভ্যতা”—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে ফরিদপুরের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটে (RRI) আড়ম্বরপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলো ‘নদী সম্মেলন-২০২৬’।

শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল সোয়া ১০টায় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পানি সম্পদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী এই সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা দেশের নদী রক্ষা ও পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।

বক্তব্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশের সবচেয়ে দূষিত তিনটি নদী—সুতাং, লবনদহ ও হাড়িধোয়া উদ্ধারে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কথা জানান। তিনি বলেন, “দেশের সবচেয়ে দূষিত এই তিনটি নদীর কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড থেকে প্রতিটি নদীর জন্য ১৫ কোটি করে মোট ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্ল্যানিং কমিশন আরও ছয়টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার বাজেট ২৯ থেকে ৪৯ কোটি টাকার মধ্যে। কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রতিটি প্রকল্পের নথিপত্র ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ মনিটরিং করতে পারে।”
বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে চীনের সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বুড়িগঙ্গার তলদেশে জমে থাকা পলিথিন অপসারণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে চীনের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে। আমার ধারণা, চাইনিজ কারিগরি সহায়তা ছাড়া এই জটিল কাজ সম্পন্ন করা কঠিন।”

স্বতন্ত্র নদী মন্ত্রণালয়ের দাবির বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, “নদী মন্ত্রণালয় একটি হওয়া উচিত—এই দাবির সঙ্গে আমি একমত। তবে বর্তমান সরকারের স্বল্প সময়ে এনবিআর-এর মতো প্রতিষ্ঠান ভাগ করতেই বেগ পেতে হয়েছে, তাই নদী রক্ষা কমিশন ও নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটকে এক ছাতার নিচে আনা এই মুহূর্তে সরকারের সামর্থ্যের বাইরে।”
এছাড়া নদী থেকে পাথর ও বালু উত্তোলনের প্রভাব নিরূপণে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। কোথায় এবং কীভাবে বালু উত্তোলন করা যাবে, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করার ওপর তিনি জোর দেন।

নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এস এম আবু হোরায়রা’র সভাপতিত্বে উদ্বোধনী সেশনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ড. মোঃ আলউদ্দিন হোসেন। দিনব্যাপী এই সম্মেলনে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নদী সংরক্ষণ বিষয়ক একাধিক কারিগরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম অধিবেশনে ‘সাশ্রয়ী ও টেকসই পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় হাইব্রিড মডেলিং’ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান। দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নদী ও পরিবেশ সংরক্ষণ’ বিষয়ে প্রবন্ধ পেশ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মাসুদ ইকবাল মোঃ শামীম।
সম্মেলনের তৃতীয় পর্বে ‘নদী সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক ইন্টার্যাক্টিভ আলোচনায় অংশ নেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মোঃ মঞ্জুরুল কিবরিয়া এবং বাপা-এর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। সেশনটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনি হেসেন।

দুপুরে অতিথিরা নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ প্রকল্প ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। সম্মেলনের সহযোগিতায় ছিল ফরিদপুর জেলা প্রশাসন, ওয়ারপো (WARPO), বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। বিকেলে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পিঠা উৎসবের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এই সম্মেলনের লব্ধ জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত নদী রক্ষা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

সম্পৃক্ত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button