সাতক্ষীরায় তীব্র জ্বালানি সংকট: সেচ ব্যাহত হওয়ায় ধান উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে ডিজেল সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলার কৃষকরা। বোরো ও ইরি মৌসুমে সেচ পাম্প চালাতে ডিজেল না পেয়ে ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও মিলছে না প্রয়োজনীয় তেল। সরকারিভাবে কোনো ঘাটতি নেই বলা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষ, পরিবহন চালক এবং কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক পাম্পে তেল নেই জানিয়ে গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও মিললেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।

পাম্পে তেল নিতে আসা সদর উপজেলার কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, “ধানের জমিতে পাঁচ-ছয় দিন ধরে পানি দিতে পারছি না। পানির অভাবে জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ দিন ধরে পাম্পে ঘুরেও তেল পাচ্ছি না। তারা বলছে কাল আসেন, কিন্তু কাল এলেও তেল মিলছে না। এখন কী করবো বুঝতে পারছি না।” দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে চলতি মৌসুমে ধান উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।

জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা সাধারণ মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গত ১৭ মার্চ রাতে পাম্পে তেল আসার খবরে শত শত মানুষ ইফতারের পর থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় জমান। রাত ২টা-আড়াইটা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।

সংকটের এক মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে সাতক্ষীরা শহরের এ.বি. খান ফিলিং স্টেশনের সামনে। ফরহাদ হোসেন সুজন নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ময়নাতদন্ত শেষে একটি লাশ নিয়ে একটি ইঞ্জিনভ্যান প্রতাপনগরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ভ্যানটিতে পর্যাপ্ত ডিজেল না থাকায় লাশ নিয়ে চালককে দীর্ঘ সময় পাম্পের সামনে অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও কষ্টের সৃষ্টি হয়েছে।

মোটরসাইকেল চালক আলতাফ হোসেন বাবু বলেন, “সরকার বলছে তেলের সংকট নেই, অথচ পাম্পে এসে তেলের দেখা নেই। মানুষ আতঙ্কে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করছে। আমি নিজে ৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি।” চালক রায়হান সিদ্দিক বলেন, এই বিশৃঙ্খলার পেছনে পাম্প মালিকদের কোনো কারসাজি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এদিকে ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, তাদের প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র অর্ধেক জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে চাহিদা মেটাতে না পেরে তারা হিমশিম খাচ্ছেন এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অনেক সময় পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খোলা বাজারে চড়া দামে বোতলে করে তেল বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সামনে ঈদ এবং বর্তমান ইরি মৌসুমের সেচ কাজ অব্যাহত রাখতে প্রশাসনের কঠোর তদারকি দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তারা মনে করেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি রোধ করা সম্ভব। কৃষকদের বাঁচাতে এবং জনজীবন স্বাভাবিক করতে দ্রুত পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাতক্ষীরাবাসী।

সম্পৃক্ত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button